Agaminews
Dr. Neem Hakim
Dr. Neem Hakim

সংবাদপত্রের মালিকানা সাংবাদিকদের হাতে নেই


আগামী নিউজ | ড. নিম হাকিম প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২০, ১২:৪৭ পিএম
সংবাদপত্রের মালিকানা সাংবাদিকদের হাতে নেই

ফাইল ছবি

ঢাকা : সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ। এটি একটি দেশ ও জাতিকে যেমন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তেমনি জাতির সর্বনাশও করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংবাদ কিভাবে পরিবেশন করা হয় সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংবাদ নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ হলে সমাজে শান্তি আনে, আর খারাপ খবর কখনও কখনও সমাজকে বিষিয়ে তোলে, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। 

কিন্ত সেই সংবাদপত্রের মালিকানা এখন সাংবাদিকদের হাতে নেই। সংবাদপত্র চলে গেছে ব্যবসায়ী বা পূুঁজিপতিদের হাতে। এই ব্যবসায়ীরা সংবাদপত্রকে তাদের ব্যবসা রক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা নেয়ার হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়ে প্রকৃত সাংবাদিকদের করছে বঞ্চিত ও নিষ্পেশিত।

সংবাদপত্রকে বলা হয় রাষ্টের ‘ফোর্থ স্টেট’। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট গ্যালারিতে উপস্থিত সংবাদপত্র প্রতিনিধিদের লক্ষ্য করে এডমন্ড বার্ক এমনটাই বলেছিলেন। তখন থেকেই রাষ্ট্র্র্র কাঠামোতে সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা বোঝাতে এই শব্দটি চলে আসছে বিশ্বজুড়ে। 

গণ মানুষের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, মানবাধিকার উন্নয়নে ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে, গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে আমাদের দেশের ইতিহাসের সাথে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ভূমিকার বিষয়টি একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগ্রামে সংবাদপত্র বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ভূমিকা কী ছিল তা সচেতন পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবেন। কিন্ত হাল আমলে? 

সংবাদপত্র কীভাবে তার স্বরুপ বদল করছে একটু পিছন ফিরে তাকালেই তা বুঝতে পারা যায়। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী যুগে সংবাপত্র লালিত হত দলীয় ছত্রছায়ায়। সে সময় একজন সাংবাদিককে ভাবা হত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে, পেশাগত পরিচয়ের চেয়ে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও সেই কালচার চালু ছিল। ৭৫ পরবর্তী সময়কালে, দেশে অনেকে সরকারের সঙ্গে সু-সম্পর্ক ও সান্নিধ্যে থাকার ফলে পুঁজিপতি হয়ে উঠেন। তাদের অর্জিত সম্পদের প্রসার ও রক্ষার জন্য সেইসব পুঁজিপতিরা মিডিয়ার দারস্ত হন। 

ফলশ্রুতিতে,  ৯০ দশকের গোড়ার দিকে হঠাৎ করে সংবাদপত্র শিল্পে পুঁজিপতিদের আগমন ঘটে। অল্প সময়ের মধ্য অনেকে পত্রিকার মালিক হন।  মূলতঃ সেই সময়কাল থেকেই সমাজপতি ও পুঁজিপতিদের দখলে মিডিয়ার প্রসার ঘটেছে। পরবর্তীতে দেশে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ও বেসরকারি রেডিওর যাত্রা শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় সমাজের ধনী শ্রেণির মানুষরা সম্পদের অবাধ প্রসার ও সংরক্ষণেই একের পর এক মিডিয়ার মালিক হতে থাকেন। তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন 'মিডিয়া মোঘল' হিসেবে।

যার কারণে কিছু মানুষের অবৈধ্যভাবে গড়ে ওঠা সম্পদ পাহারায় সংবাদপত্র ও টেলিভিশন মিডিয়ায় নিজেকে জাহির করতে লেগে থাকেন আর 'সাহেদদের' মতো মানুষের নিকট মিডিয়ার মালিকানা চলে যায়। এসব দাগী অপরাধী, মুনাফা খোর, দালালদের নিকট চলে যাবার কারণে তারা সংবাদপত্রের সুবিধা নিয়ে একদিকে যেমন নিজেরা সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তেমনি নানান সুযোগ সুবিধা নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকজনের সাথে সখ্যতা তৈরি করে সমাজে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে জাহির করেছেন। 

ফলে, সমাজে অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে এবং সাংবাদিক বা সংবাদ শিল্পের উপর মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। আস্তে আস্তে সংবাদপত্র রাষ্ট্র্রের 'ফোর্থ স্টেট' এর ক্ষমতা নিম্নমূখী করে তুলছে। যারা মানব সেবার ব্রত নিয়ে মহান পেশা সাংবাদিকতায় এসেছেন তারা কোনঠাসা হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। তারা প্রতিনিয়ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। 

এর ফলে সাংবাদিকদের ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ করতে দেখা যায়না। এখন সম্পাদক সাহেব নিজেই বলেন যে, এটা নেয়া যাবে না, দেয়া যাবে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা দেখছি যে, চাটুকারিতা এমন এক পর্যায় চলে গেছে তাতে প্রফেশনাল চাটুকাররা লজ্জা পায়। এটাই বাস্তব চিত্র। ফলশ্রুতিতে অবৈধ সম্পদের মালিকরা আসল সাংবাদিকদেরকে এই পেশা থেকে ঝেটিয়ে বিদায় দিয়ে তাদের দলদাস লোকদের পেশায় এনে পেশাকে কলুষিত করছেন। 

মার্কিন বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ ও লেখক নোয়াম চমস্কির মতে, গণমাধ্যমসমূহের প্রাথমিক কাজ হলো বিজ্ঞাপনদাতাদের নিকট অডিয়েন্সকে বিক্রি করা। অর্থাৎ বিজ্ঞাপনদাতারা গণমাধ্যমকে টাকা দেয় বিজ্ঞাপন প্রচার বা ছাপার জন্য আর সেই বিজ্ঞাপন দেখে ব্যক্তি বা ভোক্তা পণ্য ক্রয় করে। বিজ্ঞাপনই গণমাধ্যমগুলোর আয়ের প্রধান উৎস। তাই তারা বিজ্ঞাপনদাতা বা কর্পোরেট-কোম্পানিগুলোর স্বার্থই বড়ো করে দেখে, পাঠকের বা জনগণের স্বার্থ চিন্তা করা তাদের কাছে সেকেন্ড প্রায়োরিটি। 

তেমনি বিশ্বব্যাপী পরাশক্তি ও সাম্রাজ্যবাদীশক্তিগুলো যেনতেনভাবে মিডিয়াকে তাদের স্বার্থেই ব্যাবহার করছে। বিশেষকরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের একক  পরাশক্তির দাপট টিকিয়ে রাখতে পৃথিবীর দেশে দেশে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে চলেছে। তারা চায় তাদের দেশের পুঁজিপতিদের স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে। এজন্য গোটা দুনিয়া যেন তাদের দলদাস। তাদের স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটলে তারা কিছুই মানতে চায় না। 

আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা লেগেই আছে। এসব দেশের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য বা সংবাদ পরিবেশন করে যুদ্ধ শুরু করেছে। ইরাকে রাসায়নিক অস্ত্র মজুদের অজুহাত তুলে সমগ্র দুনিয়াকে মিথ্যা সংবাদ গিলিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র বোমা মেরে প্রাচীন সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ইরাককে ধ্বংস করে দিয়েছে। এর পিছনে মূলত ইরাকের তেল সম্পদ দখলের পায়তারা ছিল। বিশ্বের ১০ শতাংশ তেল ইরাকে উৎপাদিত হয়। সৌদি আরবে ২৫ শতাংশ। মাত্র ০৩ শতাংশ তেল আমোরিকায় এই সত্য জানা না থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের হিসাবে বুঝে নেয়া সহজ হবে না। 

চিন্তা করুন, দেশে বিদেশে পুঁজিপতিদের হাতে কিভাবে সংবাদ পত্রের মালিকানা গিয়ে সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে মালিকদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার হচ্ছে। যেখানে গণ মানুষের কথা বলার কথা সেখানে কিভাবে পুঁজিপতিদের কথা কৌশলে বলে দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিপদগ্রস্থ করে তুলছে।

 

Dr. Neem