Agaminews
Dr. Neem Hakim

বিদেশি বৃক্ষের আগ্রাসনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ


আগামী নিউজ | তরিকুল ইসলাম সুমন প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২০, ০৯:১৩ এএম
বিদেশি বৃক্ষের আগ্রাসনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ

ছবি সংগৃহীত

ঢাকা: দ্রুত সময়ের মধ্যে অধিক মুনাফা লাভের আশায় গত কয়েক যুগ আগে থেকেই বাংলাদেশের বনাঞ্চল, রাস্তার ধারে ও ব্যক্তি উদ্যোগে বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ করা হচ্ছে। ফলে দেশিয় প্রজাতির মূল্যবান কাঠ ও ফলের গাছ এবং ওষুধি বৃক্ষের চাষ, উৎপাদন ও সংরক্ষণের বিষয়টি প্রায় উপেক্ষিত। এসব বিদেশি গাছ গাছালি কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি বয়ে আনছে। রাস্তার পাশে লাগানো এসব গাছের ছায়ায় জন্মানো ধান গাছে রোগ ও পোকার আক্রমণ মারাত্মক হারে দেখা দিচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের একজন সাবেক অধ্যাপক জানান, বিদেশি গাছ আমাদের পরিবেশ এবং আমাদের প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা দেশি প্রজাতির জন্য হুমকি স্বরুপ। বিদেশি গাছ ও দেশী গাছ পাশাপাশি থাকতে বা বংশ বৃদ্ধি করতে পারে না। কারণ বিদেশি গাছের মূল থেকে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ বের হয় যা দেশি গাছের জন্য ক্ষতিকর। 

তিনি আরো বলেন, এছাড়া এদেশের পশু-পাখি বিদেশি গাছের ফুল-ফলও খায় না। উপকারি কীটপতঙ্গও মরে যায়। যা গাছ ও প্রকৃতির জন্য ভয়াবহ। এর প্রভাব একসময় পুরো মানব সমাজের উপর পড়বে বলে মনে করেন তিনি। এ কারণে আমাদের এসব বিদেশি বৃক্ষ লাগান থেকে বিরত থাকতে হবে। এ বিষয়ে সরকারে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা)চেয়ারম্যান আবু নাসের খান আগামীনিউজ ডটকমকে বলেন, আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের বাইরে নতুন কোনো কিছু খাপ খাওয়াতে চাইলে এর ক্ষতিকর প্রভাব আমাদের সইতে হবে। মানুষের উদাসীনতায় বা কখনও কখনও অনিচ্ছাকৃতভাবেই এগুলোর বিস্তার ঘটে। বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তারলাভ করে। বিদেশি প্রজাতি যেখানে থাকবে সেখানকার মাটি, পানির গুণাগুণ, খনিজ পদার্থের পরিবর্তন তথা পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থার বহুমুখী ক্ষতি করবে। এতে করে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে। 

তিনি আরো বলেন, আমরা দেশি গাছ লাগানোর জন্য প্রচার চালাই। কিন্তু নানা কারণে বিদেশি গাছের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। সরকারিভাবে এ ব্যাপারটাকে সামনে আনা উচিত।

তিনি জানান, বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির বৃক্ষ ও উদ্ভিদ নিয়ে ব্যপক গবেষণার প্রয়োজন। বিদেশি প্রজাতির স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের কুফল রয়েছে। সুফল রয়েছে তার তুলনায় অনেক কম। দেশি প্রজাতির উদ্ভিদ বা বৃক্ষরাজি সংরক্ষণ না করে বিদেশি প্রজাতি বিস্তারের ক্ষেত্র তৈরি করি তাহলে ক্রমশ দেশের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হতে থাকবে। তাই জীববৈচিত্র্য তথা গোটা পরিবেশকে রক্ষা করতে বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির আগ্রাসন বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপক আগামীনিউজ ডটকমকে জানান, নিষিদ্ধ হওয়ার পরও বন বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন নার্সারিতে বিদেশি বৃক্ষের চারা উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে ২০০৮ সালে সরকার পরিবেশের ক্ষতির কারণ দেখিয়ে বনায়নের জন্য ইউক্যালিপটাশ গাছটিকে নিষিদ্ধ করেছিল।

তিনি আরো বলেন, কিছু বহুজাতিক কোম্পানির প্ররোচনায় এসব বৃক্ষ রোপন করে আমাদের দেশীয় প্রজাতি নষ্ট করে পরনির্ভরশীল করে তুলছে। যাতে করে আমরা তাদের উপর নির্ভর করি। পরিবেশ পরিস্থিতি তাদেরই পরামর্শ নিতে হয় আমাদের।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, উত্তরাঞ্চলের জমির আইল ও ছোট-বড় ফলের প্রায় চার হাজার বাগানের ৬০ শতাংশ জায়গা এরই মধ্যে দখল করে নিয়েছে ইউক্যালিপটাস। শুধু বগুড়া অঞ্চলেই তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী ইউক্যালিপটাস গাছের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি এবং এক থেকে দুই বছরের অধিক বয়সী ইউক্যালিপটাস গাছের সংখ্যা প্রায় চার কোটি বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। একটি পূর্ণ বয়স্ক ইউক্যালিপটাস গাছ ২৪ ঘণ্টায় ভূগর্ভ থেকে প্রায় ৯০ লিটার পানি শোষণ করে। এতসব ক্ষতির কারণ থাকলেও দিনে দিনে ইউক্যালিপটাস গাছের সংখ্যা বাংলাদেশে বেড়েই চলেছে। 

উদ্ভিদবিদরা জানান, আশির দশকে দেশে এই গাছের প্রসার ঘটে। এটি মূলত মরু অঞ্চলের গাছ। গাছটি মাটি থেকে অনেক বেশি খাবার ও পানি শোষণ করে। যেসব এলাকায় এই গাছ বেশি আছে, সে এলাকার পানির স্তর অনেক নিচে চলে যায়। এই গাছের পাতা সহজে পচে মাটিতে মিশে না। বন বিভাগ দেশে ক্ষতিকর ১২টি গাছকে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে এক নম্বরে ইউক্যালিপটাস।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন প্রকল্প (ইউএনডিপি) এর উদ্যোগে ইউক্যালিপটাসসহ বিভিন্ন বিদেশি দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতির গাছ আমাদের দেশে আসে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে উপজেলা পর্যায়ের ‘সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি’ এবং সরকারের বন বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইউক্যালিপটাস, আকাশমনি, পাইন ইত্যাদি বিদেশি গাছ ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়েছে। বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, রংপুর প্রভৃতি অঞ্চলগুলোতে এ গাছের চারা প্রথমে প্রথম ব্যাপকভাবে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। বাংলাদেশের জলবায়ু, মাটি ও কৃষি জমিতো বটেই দ্রুত বর্ধনশীল এই গাছটি পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। সাধারণ মানুষের উপর একসময় ইউক্যালিপটাস চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা ছাড়াই। ২০১২ সালের জানুয়ারী থেকে দেশে পাউলোনিয়া বৃক্ষ রোপনের প্রচলন শুরু করে ডেসটিনি। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর মেহগনি, সেগুন, আকাশমনি, একাশিয়া, একাশিয়া হাইব্রিড, শিশু, ইউক্যালিপটাশ, ইপিলইপিল, রাবার, তেল পাম, রেইনট্রি, পাউলোনিয়া, পাইন, ম্যালালুকা, সাফিয়ান, কেকারান্দা, লংগু, রয়্যাল পাম, আফ্রিকান টিউলিপ, আপসাইড ডাউন ট্রি, সিলভার ওক, ব্রেডফ্রন্ট ট্রিসহ প্রায় ২শত প্রজাতির বিদেশি গাছ রয়েছে বাংলাদেশে। 

আগামীনিউজ/তরিকুল/মিজান  

Dr. Neem